ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়ে চলমান বিতর্ক ও তোলপাড় শিক্ষাঙ্গনের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য যে এক অশনিসংকেত, তা বলাই বাহুল্য। নীলক্ষেতে ব্যালট পেপার অরক্ষিত অবস্থায় ছাপানোর গুরুতর অভিযোগ থেকে এই বিতর্কের সূত্রপাত, যা ইতোমধ্যে নির্বাচনটির স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। কারও কারও মতে, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও এই অভিযোগের জেরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা এবং বিভিন্ন প্যানেল ও শিক্ষক সংগঠনের পালটাপালটি বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
উল্লেখ্য, ডাকসু নির্বাচনের আট দিন পর সাধারণ সম্পাদক পদে দাঁড়ানো এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে করা পোস্ট এবং পরে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নীলক্ষেতের জালাল প্রিন্টিং প্রেস ও মক্কা পেপার কাটিং হাউজে ব্যালট পেপার ছাপানোর ঘটনা জনসমক্ষে আসে। প্রেসের মালিকের বক্তব্যের ভিন্নতা এবং সরবরাহের হিসাবে গরমিল (যেমন ৯৬ হাজার, ৮৮ হাজার বা ৮৬ হাজার ব্যালটের কথা) পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট এক সরবরাহকারীর দাবি, নীলক্ষেতে কেবল প্রাথমিক ছাপার কাজটি হয়েছে এবং সেগুলো ব্যবহার উপযোগী ব্যালট পেপার ছিল না, তবুও স্পর্শকাতর ব্যালট পেপারের মতো জিনিস অরক্ষিত অবস্থায় বহিরাগত স্থানে ছাপানো এবং তা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হওয়া নির্বাচন প্রক্রিয়ার পেশাদারি নিয়ে সন্দেহ জাগায় বৈকি। ভিপি পদে নির্বাচনে লড়াই করা এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পেশাদারির ব্যাপারে সন্দেহ তৈরির সুযোগ থাকে।
এদিকে ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা এ ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং দ্রুতই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। অন্যদিকে, বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন ও অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফলাফল স্থগিত করে পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আর ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) সাদা দলের বিবৃতিকে ‘দ্বিচারিতা ও দ্বিমুখী আচরণ’ বলে মনে করছে। তাদের মতে, যখন নির্বাচন পরিচালনার অধিকাংশ দায়িত্ব সাদা দলের শিক্ষকদের হাতে ছিল, তখন তাদের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ নৈতিক প্রশ্ন তোলে। তারা প্রশাসনকে অযৌক্তিক প্রশ্নের সুরাহা এবং শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট কেড়ে নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদও সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের অভাবকে ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হিসাবে দেখছেন।
এই পরিস্থিতিতে শুধু দোষারোপের রাজনীতি বা পালটাপালটি বিবৃতি কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা। এ তদন্তে ব্যালট পেপার ছাপানোর পুরো প্রক্রিয়া, ব্যবহৃত কাগজ ও ব্যালট পেপারের সংখ্যা এবং কেন তা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে করা হলো-এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা জরুরি। যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে থাকে, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাই কাম্য। ভুলে গেলে চলবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন অপরিহার্য। এটি কেবল ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নয়, বরং বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আন্তরিকতার পরিচয় দেবে, এটাই প্রত্যাশা।




















