অবহেলা ও অমানবিক বাস্তবতা
-
সম্পাদকীয়
-
আপডেট সময় :
০৬:২৪:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫
- 84
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আজও সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য খাতগুলোর একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে ভুগছে, অথচ এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ মানুষ কখনো কোনো চিকিৎসা নেয়নি। এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি এক গভীর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানসিক অসুস্থতাকে রোগ নয়, বরং লজ্জা বা পাগলামি হিসেবে দেখা হয়। ফলে মানুষ চিকিৎসার বদলে লুকিয়ে থাকে সমাজের উপহাস ও অবজ্ঞার ভয়ে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ৭৫ শতাংশই সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিস-অর্ডারে আক্রান্ত, যার মধ্যে আবার ৪৫ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এই তথ্য তরুণ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জোবায়ের মিয়া যেমনটি বলেছেন, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই তাঁদের অসুস্থতা স্বীকার করেন না, যা তাঁদের চিকিৎসাপ্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তোলে বিপর্যয় বা জরুরি পরিস্থিতিতেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত কম।
রানা প্লাজা ধস বা জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মতো বড় ঘটনাগুলোর পর মানসিক সমস্যা দেখা দিলেও আহত ব্যক্তিরা মনে করেন তাঁদের কোনো মানসিক সমস্যা নেই, যা এই সেবা গ্রহণে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, বাইপোলার ডিস-অর্ডারের মতো ব্যাধিগুলোই বছরে ২০ হাজারেরও বেশি আত্মহত্যার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ।এই অবহেলার চিত্র আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যেখানে রোগীর সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে দেখা গেছে নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা দিয়ে অবাধে প্রবেশ করছে লোকজন।
তারা রোগীদের নিয়ে তামাশামূলক ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ এক নির্মম, অমানবিক আচরণ, যা শুধু রোগীর মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, বরং চিকিৎসাপ্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে। মানসিকভাবে দুর্বল মানুষকে নিয়ে এমন উপহাস সভ্য সমাজে অকল্পনীয়। এ ঘটনায় প্রশাসনিক উদাসীনতা স্পষ্ট। ৫০০ শয্যার হাসপাতালে যেখানে ৫০ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে আছেন মাত্র ২২ জন।
অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও কাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি।মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতাল নির্মাণ বা দিবস পালনের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট গড়ে তোলা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং ও মনোচিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। একই সঙ্গে পাবনা মানসিক হাসপাতালে রোগীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতে অবিলম্বে কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা মানে মানবিকতাকে অবজ্ঞা করা। রোগী নয়, অসুস্থ মানসিকতা বদলানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।