ঢাকা ১১:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি পরিচালনা, বাড়তে পারে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা

ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০২৬ চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দুবাই পোর্টস ওয়ার্ল্ড (ডিপি ওয়ার্ল্ড)। গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, বন্দরের সক্ষমতা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বন্দর পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনা কাজে লাগানো গেলে কনটেইনার ওঠানো-নামানো, পণ্য খালাস এবং জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও গতি আসতে পারে।

তবে চুক্তির আর্থিক দিক, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ, বন্দরের নিরাপত্তা, পরিচালনাগত কর্তৃত্ব এবং চুক্তির সব শর্ত প্রকাশ না করার বিষয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে চুক্তিটির সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি বাস্তবায়নের শর্ত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও আলোচনা চলছে।

আধুনিক ব্যবস্থাপনায় বদলে যেতে পারে বন্দরের কার্যক্রম

বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা ও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে এ সক্ষমতা ৬০ শতাংশে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, টার্মিনালের অবকাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হবে। এর ফলে বর্তমানে যেসব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কয়েক দিন সময় লাগে, সেগুলো আরও কম সময়ে শেষ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন দিনের কাজ এক দিনে নামিয়ে আনার প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়েছে।

বন্দর পরিচালনায় সময় কমানো সম্ভব হলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় কমতে পারে। সংশ্লিষ্ট পূর্বাভাসে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পণ্য ওঠানো-নামানোর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, অনিয়ম কমানো এবং সেবার মান উন্নয়নের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, বন্দরের কার্যক্রমে ধারাবাহিক গতি এলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের। প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও পরিচালনাগত দক্ষতা কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।

তাঁদের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অংশের জন্য সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়লে ভবিষ্যতে এ নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে বড় জাহাজের আগমন, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চুক্তির মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটিকে আধুনিক টার্মিনালে রূপান্তরের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত বিভিন্ন টার্মিনালের অভিজ্ঞতা চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ।

তবে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক বন্দর কার্যক্রমের ওপর।

বন্দরের নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা

এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাওয়ার পর বন্দরের কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের বক্তব্য, টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া আর বন্দরের মালিকানা হস্তান্তর করা এক বিষয় নয়।

তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে গেলেও জমি, জেটি ও বন্দরের মূল সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। বন্দর ও নৌবাহিনীর অধীনে নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এ চুক্তির কারণে বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই। বরং আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিচালনব্যবস্থা চালু হলে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির নির্ধারিত শর্ত ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বিদ্যমান কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে নতুন পরিচালনব্যবস্থার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে বাস্তবে কর্মীদের নিয়োগ, দায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত এবং বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, কমবে সময় ও ব্যয়

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের অনেকে। তাঁদের প্রত্যাশা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালু হলে পণ্য খালাসে বিলম্ব কমবে, আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রম দ্রুত হবে এবং বন্দরে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও হয়রানি হ্রাস পাবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চুক্তিটিকে ব্যবসা ও রপ্তানি খাতের জন্য সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় এনসিটির কার্যক্রমে গতি এলে রপ্তানির সময় ও ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে বন্দরে হয়রানি ও ঘুষের মতো অভিযোগ কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

হাতেমের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে বিদেশি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনায় অভিজ্ঞতা থাকায় ডিপি ওয়ার্ল্ডও এনসিটির কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি মনে করেন, এ উদ্যোগের ফলে বন্দরের কার্যক্রমে গতি বাড়লে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য উপকৃত হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। চুক্তির বিরোধিতাকারীদেরও আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো যৌক্তিক আপত্তি থাকলে তা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরা উচিত। প্রয়োজনে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে পারে।

চুক্তির আর্থিক দিক নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য

চুক্তির আর্থিক শর্ত নিয়েও ব্যবসায়ী মহলে আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিটি ২০ ফুট সমপরিমাণ কনটেইনারের বিপরীতে টার্মিনালের গড় রাজস্বের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব অংশ বা রয়্যালটি পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্ধারিত ফি দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

চুক্তিতে বছরে অন্তত ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এ ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে সমন্বয় করার সুযোগও রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, চুক্তি অনুযায়ী টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে এককালীন পাঁচ কোটি ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ২৫ শতাংশ এবং টার্মিনাল বুঝিয়ে দেওয়ার আগে বাকি ৭৫ শতাংশ পরিশোধের শর্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বিনিয়োগ, অগ্রিম অর্থ, নির্ধারিত ফি এবং রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়গুলো আলাদা আর্থিক শর্তের অন্তর্ভুক্ত। এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে চুক্তির মূল নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসায়ী নেতাদের মূল্যায়ন

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম রয়েছে এবং ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশেও প্রতিষ্ঠানটি একাধিক বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনা করছে। তাঁর প্রত্যাশা, এনসিটিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি যুক্ত হলে বন্দরের কার্যক্রমে উন্নতি ঘটবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক অপারেটরের বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বার ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত পরিচালক এবং বাদশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আলম বাদশাও চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের যুক্ত হওয়ার ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ না করেও পরিচালনাগত উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও মনে করেন, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন ও আধুনিক পরিচালনব্যবস্থা চালু হলে বন্দরের কার্যক্রমে বিদ্যমান জটিলতা এবং অনিয়ম কমানোর সুযোগ থাকবে। এতে বন্দর ও দেশের অর্থনীতি উভয়ই লাভবান হতে পারে।

বাংলাদেশ নন-প্যাকার্স ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাহবুব রানাও ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অঞ্চলে বন্দর পরিচালনা করছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে।

তিনি আশা করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ নিশ্চিত করা গেলে বন্দরের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তিও উন্নত হতে পারে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদও চুক্তিটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া চালু হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে এবং জাহাজের বন্দরে অবস্থানের সময় কমতে পারে।

তবে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাশুলের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিচালনায় দক্ষতা বাড়লে ব্যবসার ব্যয় কমার কথা; কিন্তু বন্দর চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে সেই সুবিধা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বিশ্বজুড়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম

ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্দর, কনটেইনার টার্মিনাল, লজিস্টিকস হাব এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিস্তৃত।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারত, চীন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভারতের নাভা শেভা, চেন্নাই, কোচিন, মুন্দ্রা ও বিশাখাপত্তনমের মতো বন্দরের টার্মিনাল কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউরোপে যুক্তরাজ্যের লন্ডন গেটওয়ে ও সাউদাম্পটনসহ বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প এবং নেদারল্যান্ডসের রটারড্যামের মতো বন্দরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। এ ছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, সাইপ্রাস, রোমানিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন ও সুইডেনের বিভিন্ন বন্দর ও টার্মিনালেও তাদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত জেবেল আলি বন্দর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যক্রমগুলোর অন্যতম। সৌদি আরবের জেদ্দা ইসলামিক পোর্ট পরিচালনার সঙ্গেও ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত।

আফ্রিকায় মিসর, আলজেরিয়া, সেনেগাল, সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, রুয়ান্ডা ও তানজানিয়ার দার এস সালাম বন্দরের কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর আমেরিকায় কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ও প্রিন্স রুপার্ট এবং দক্ষিণ আমেরিকায় পেরুর ক্যালাও, ব্রাজিলের সান্তোস ও আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসসহ বিভিন্ন বন্দরে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নত করাই এখন চুক্তিটির অন্যতম প্রত্যাশিত দিক।

এনসিটি পরিচালনায় চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত

প্রতিবেদনে উল্লেখিত চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করবে। উভয় পক্ষ সম্মত হলে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

চুক্তিতে পরিচালনার অধিকার ও দায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত, পরিবেশগত ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা, ন্যূনতম সেবার মান, মাশুল নির্ধারণ এবং সম্পদের মালিকানার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মেয়াদ বৃদ্ধি, জেটির সামনের খননকাজ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিস্থিতি, চুক্তি বাতিল, ক্ষতিপূরণ, বন্দর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ, গোপনীয়তা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মেয়াদ শেষে টার্মিনাল হস্তান্তরের বিষয়ও চুক্তির অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা চুক্তির সব ধারা সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। বিনিয়োগের ঝুঁকি, পরিচালনাগত দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় চুক্তির কোন অংশ প্রকাশ করা হবে, তা দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে। তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে চুক্তির আর্থিক শর্ত, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখার দাবি গুরুত্ব পেতে পারে।

শ্রমিক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ কী হবে?

এনসিটি পরিচালনায় নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ার পর শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের বক্তব্য, চুক্তির কারণে বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালু হলে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।

সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হলে বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জনবলের চাহিদাও বাড়তে পারে।

তবে কর্মীদের চাকরি, দায়িত্ব, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই চুক্তির কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বন্দরের অভিজ্ঞতা

দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বা ইজারার আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের দক্ষিণ টার্মিনাল ৩৫ বছরের চুক্তিতে চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংসের পরিচালনায় রয়েছে। একই বন্দরের পশ্চিম টার্মিনালে ভারতের আদানি পোর্টস ও জন কিলসের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির হাম্বানটোটা বন্দরের পরিচালনার দায়িত্বও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে চীনের চায়না মার্চেন্টস পোর্টের হাতে রয়েছে।

ভারতের জওহরলাল নেহেরু বন্দরের একাধিক টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বিদেশি অপারেটরদের পরিচালনায় রয়েছে। মুন্দ্রা, চেন্নাই, কোচিন ও তুতিকোরিন বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত।

পাকিস্তানের করাচি বন্দর, কাসিম বন্দর ও গোয়াদর বন্দরের পরিচালনায়ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ২২ বছরের চুক্তিতে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের হাতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এবার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনব্যবস্থায় আরেকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে এনসিটি পরিচালনার চুক্তিকে ঘিরে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে এসব সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন, আর্থিক কাঠামোর স্বচ্ছতা, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং বন্দরের কার্যক্রমে প্রকৃত উন্নতির ওপর।

বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রকল্প দেখলেন প্রধানমন্ত্রী

ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি পরিচালনা, বাড়তে পারে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা

আপডেট সময় : ০৩:৪৪:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০২৬ চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দুবাই পোর্টস ওয়ার্ল্ড (ডিপি ওয়ার্ল্ড)। গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, বন্দরের সক্ষমতা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বন্দর পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনা কাজে লাগানো গেলে কনটেইনার ওঠানো-নামানো, পণ্য খালাস এবং জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও গতি আসতে পারে।

তবে চুক্তির আর্থিক দিক, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ, বন্দরের নিরাপত্তা, পরিচালনাগত কর্তৃত্ব এবং চুক্তির সব শর্ত প্রকাশ না করার বিষয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে চুক্তিটির সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি বাস্তবায়নের শর্ত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও আলোচনা চলছে।

আধুনিক ব্যবস্থাপনায় বদলে যেতে পারে বন্দরের কার্যক্রম

বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা ও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে এ সক্ষমতা ৬০ শতাংশে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, টার্মিনালের অবকাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হবে। এর ফলে বর্তমানে যেসব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কয়েক দিন সময় লাগে, সেগুলো আরও কম সময়ে শেষ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন দিনের কাজ এক দিনে নামিয়ে আনার প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়েছে।

বন্দর পরিচালনায় সময় কমানো সম্ভব হলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় কমতে পারে। সংশ্লিষ্ট পূর্বাভাসে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পণ্য ওঠানো-নামানোর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, অনিয়ম কমানো এবং সেবার মান উন্নয়নের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, বন্দরের কার্যক্রমে ধারাবাহিক গতি এলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের। প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও পরিচালনাগত দক্ষতা কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।

তাঁদের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অংশের জন্য সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়লে ভবিষ্যতে এ নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে বড় জাহাজের আগমন, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চুক্তির মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটিকে আধুনিক টার্মিনালে রূপান্তরের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত বিভিন্ন টার্মিনালের অভিজ্ঞতা চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ।

তবে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক বন্দর কার্যক্রমের ওপর।

বন্দরের নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা

এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাওয়ার পর বন্দরের কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের বক্তব্য, টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া আর বন্দরের মালিকানা হস্তান্তর করা এক বিষয় নয়।

তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে গেলেও জমি, জেটি ও বন্দরের মূল সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। বন্দর ও নৌবাহিনীর অধীনে নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এ চুক্তির কারণে বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই। বরং আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিচালনব্যবস্থা চালু হলে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির নির্ধারিত শর্ত ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বিদ্যমান কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে নতুন পরিচালনব্যবস্থার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে বাস্তবে কর্মীদের নিয়োগ, দায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত এবং বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, কমবে সময় ও ব্যয়

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের অনেকে। তাঁদের প্রত্যাশা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালু হলে পণ্য খালাসে বিলম্ব কমবে, আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রম দ্রুত হবে এবং বন্দরে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও হয়রানি হ্রাস পাবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চুক্তিটিকে ব্যবসা ও রপ্তানি খাতের জন্য সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় এনসিটির কার্যক্রমে গতি এলে রপ্তানির সময় ও ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে বন্দরে হয়রানি ও ঘুষের মতো অভিযোগ কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

হাতেমের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে বিদেশি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনায় অভিজ্ঞতা থাকায় ডিপি ওয়ার্ল্ডও এনসিটির কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি মনে করেন, এ উদ্যোগের ফলে বন্দরের কার্যক্রমে গতি বাড়লে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য উপকৃত হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। চুক্তির বিরোধিতাকারীদেরও আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো যৌক্তিক আপত্তি থাকলে তা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরা উচিত। প্রয়োজনে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে পারে।

চুক্তির আর্থিক দিক নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য

চুক্তির আর্থিক শর্ত নিয়েও ব্যবসায়ী মহলে আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিটি ২০ ফুট সমপরিমাণ কনটেইনারের বিপরীতে টার্মিনালের গড় রাজস্বের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব অংশ বা রয়্যালটি পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্ধারিত ফি দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

চুক্তিতে বছরে অন্তত ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এ ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে সমন্বয় করার সুযোগও রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, চুক্তি অনুযায়ী টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে এককালীন পাঁচ কোটি ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ২৫ শতাংশ এবং টার্মিনাল বুঝিয়ে দেওয়ার আগে বাকি ৭৫ শতাংশ পরিশোধের শর্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বিনিয়োগ, অগ্রিম অর্থ, নির্ধারিত ফি এবং রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়গুলো আলাদা আর্থিক শর্তের অন্তর্ভুক্ত। এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে চুক্তির মূল নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসায়ী নেতাদের মূল্যায়ন

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম রয়েছে এবং ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশেও প্রতিষ্ঠানটি একাধিক বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনা করছে। তাঁর প্রত্যাশা, এনসিটিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি যুক্ত হলে বন্দরের কার্যক্রমে উন্নতি ঘটবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক অপারেটরের বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বার ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত পরিচালক এবং বাদশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আলম বাদশাও চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের যুক্ত হওয়ার ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ না করেও পরিচালনাগত উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও মনে করেন, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন ও আধুনিক পরিচালনব্যবস্থা চালু হলে বন্দরের কার্যক্রমে বিদ্যমান জটিলতা এবং অনিয়ম কমানোর সুযোগ থাকবে। এতে বন্দর ও দেশের অর্থনীতি উভয়ই লাভবান হতে পারে।

বাংলাদেশ নন-প্যাকার্স ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাহবুব রানাও ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অঞ্চলে বন্দর পরিচালনা করছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে।

তিনি আশা করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ নিশ্চিত করা গেলে বন্দরের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তিও উন্নত হতে পারে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদও চুক্তিটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া চালু হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে এবং জাহাজের বন্দরে অবস্থানের সময় কমতে পারে।

তবে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাশুলের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিচালনায় দক্ষতা বাড়লে ব্যবসার ব্যয় কমার কথা; কিন্তু বন্দর চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে সেই সুবিধা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বিশ্বজুড়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম

ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্দর, কনটেইনার টার্মিনাল, লজিস্টিকস হাব এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিস্তৃত।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারত, চীন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভারতের নাভা শেভা, চেন্নাই, কোচিন, মুন্দ্রা ও বিশাখাপত্তনমের মতো বন্দরের টার্মিনাল কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউরোপে যুক্তরাজ্যের লন্ডন গেটওয়ে ও সাউদাম্পটনসহ বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প এবং নেদারল্যান্ডসের রটারড্যামের মতো বন্দরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। এ ছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, সাইপ্রাস, রোমানিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন ও সুইডেনের বিভিন্ন বন্দর ও টার্মিনালেও তাদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত জেবেল আলি বন্দর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যক্রমগুলোর অন্যতম। সৌদি আরবের জেদ্দা ইসলামিক পোর্ট পরিচালনার সঙ্গেও ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত।

আফ্রিকায় মিসর, আলজেরিয়া, সেনেগাল, সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, রুয়ান্ডা ও তানজানিয়ার দার এস সালাম বন্দরের কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর আমেরিকায় কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ও প্রিন্স রুপার্ট এবং দক্ষিণ আমেরিকায় পেরুর ক্যালাও, ব্রাজিলের সান্তোস ও আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসসহ বিভিন্ন বন্দরে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নত করাই এখন চুক্তিটির অন্যতম প্রত্যাশিত দিক।

এনসিটি পরিচালনায় চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত

প্রতিবেদনে উল্লেখিত চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করবে। উভয় পক্ষ সম্মত হলে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

চুক্তিতে পরিচালনার অধিকার ও দায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত, পরিবেশগত ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা, ন্যূনতম সেবার মান, মাশুল নির্ধারণ এবং সম্পদের মালিকানার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মেয়াদ বৃদ্ধি, জেটির সামনের খননকাজ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিস্থিতি, চুক্তি বাতিল, ক্ষতিপূরণ, বন্দর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ, গোপনীয়তা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মেয়াদ শেষে টার্মিনাল হস্তান্তরের বিষয়ও চুক্তির অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা চুক্তির সব ধারা সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। বিনিয়োগের ঝুঁকি, পরিচালনাগত দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় চুক্তির কোন অংশ প্রকাশ করা হবে, তা দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে। তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে চুক্তির আর্থিক শর্ত, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখার দাবি গুরুত্ব পেতে পারে।

শ্রমিক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ কী হবে?

এনসিটি পরিচালনায় নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ার পর শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের বক্তব্য, চুক্তির কারণে বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালু হলে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।

সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হলে বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জনবলের চাহিদাও বাড়তে পারে।

তবে কর্মীদের চাকরি, দায়িত্ব, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই চুক্তির কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বন্দরের অভিজ্ঞতা

দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বা ইজারার আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের দক্ষিণ টার্মিনাল ৩৫ বছরের চুক্তিতে চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংসের পরিচালনায় রয়েছে। একই বন্দরের পশ্চিম টার্মিনালে ভারতের আদানি পোর্টস ও জন কিলসের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির হাম্বানটোটা বন্দরের পরিচালনার দায়িত্বও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে চীনের চায়না মার্চেন্টস পোর্টের হাতে রয়েছে।

ভারতের জওহরলাল নেহেরু বন্দরের একাধিক টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বিদেশি অপারেটরদের পরিচালনায় রয়েছে। মুন্দ্রা, চেন্নাই, কোচিন ও তুতিকোরিন বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত।

পাকিস্তানের করাচি বন্দর, কাসিম বন্দর ও গোয়াদর বন্দরের পরিচালনায়ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ২২ বছরের চুক্তিতে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের হাতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এবার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনব্যবস্থায় আরেকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে এনসিটি পরিচালনার চুক্তিকে ঘিরে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে এসব সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন, আর্থিক কাঠামোর স্বচ্ছতা, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং বন্দরের কার্যক্রমে প্রকৃত উন্নতির ওপর।