ঢাকা ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পোশাক রপ্তানিতে অগ্রাধিকার আছে, ন্যায্যমূল্য নেই

বিশ্ববাণিজ্যের বাস্তবতায় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এখন আর কোনো অতিরিক্ত সুবিধা বা ব্র্যান্ডিং কৌশল নয়; এটি একটি বাধ্যতামূলক শর্ত। জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে টেকসই উৎপাদন এখন ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—টেকসই উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য কি আমরা পাচ্ছি?

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিকসংখ্যক উচ্চমানের এলইইডি (লিড) সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার দেশ হিসেবে পরিচিত। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের শিল্পের সক্ষমতা, উদ্যোক্তাদের অঙ্গীকার এবং শ্রমিকবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণ।

তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, দেশের কয়েক হাজার পোশাক কারখানার তুলনায় সবুজ কারখানার সংখ্যা এখনো সীমিত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার দেওয়ার সময় সবুজ বা পরিবেশবান্ধব কারখানাকে অগ্রাধিকার দিলেও পণ্যের দামে সেই অগ্রাধিকারের প্রতিফলন প্রায় অনুপস্থিত।
সবুজ কারখানা গড়ে তোলা কোনো সহজ কাজ নয়। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, পানি পুনর্ব্যবহার ও শোধনাগার স্থাপন, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ—এসব নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের প্রচলিত কারখানার তুলনায় অনেক বেশি মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়।

এই বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ ও সমাজের জন্য উপকারী হলেও স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে এর আর্থিক চাপ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যখন পণ্যের দাম একই জায়গায় স্থির থাকে।ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বাজারগুলোতে পরিবেশগত স্বচ্ছতা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শর্ত এখন ক্রেতাদের কাছে কোনো প্রিমিয়াম সুবিধা নয়, বরং ন্যূনতম যোগ্যতা। অর্থাৎ শর্ত পূরণ না করলে অর্ডার পাওয়া যাবে না; কিন্তু শর্ত পূরণ করলে অতিরিক্ত মূল্য পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

ফলে টেকসই উৎপাদনের পুরো আর্থিক দায় কার্যত উৎপাদকদের কাঁধেই এসে পড়ছে।এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোর জন্য উদ্বেগজনক। বড় শিল্পগোষ্ঠী কোনোভাবে বাড়তি বিনিয়োগের চাপ সামাল দিতে পারলেও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সবুজ রূপান্তর ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এর ফলে শিল্পে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অনেক সম্ভাবনাময় কারখানা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

এই বাস্তবতায় টেকসই উৎপাদন উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কোনো বিকল্প নেই।

গ্রিন ফিন্যান্সিং, কনসেশনাল লোন এবং বিশেষ তহবিল গঠনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগঝুঁকি কমাতে হবে। একই সঙ্গে সরকারিভাবে কর প্রণোদনা, পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় এবং নীতিগত সহায়তা আরো জোরদার করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ ছাড়া শিল্পের বৃহৎ অংশকে টেকসই উৎপাদনের আওতায় আনা কঠিন হবে।তবে শুধু নীতিগত সহায়তা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে এখন ভলিউমনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ভ্যালুনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে এগোতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে কম দামে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানির যে মডেল, তা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। টেকসই উৎপাদনের সঙ্গে যদি উন্নত ডিজাইন, উচ্চমানের পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং দ্রুত উদ্ভাবন যুক্ত করা যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য আদায়ের সক্ষমতা বাড়বে।

তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। সাম্ক্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮৪ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যার মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই বাস্তবতা স্কষ্ট করে যে, পোশাকশিল্প শুধু একটি খাত নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

সবুজ বিনিয়োগে এখনো সরাসরি কর প্রণোদনা বা সমন্বিত জাতীয় নীতির অভাব স্কষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন টেকনোলজিক্যাল ফান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তুলনামূলক কম সুদে এই অর্থায়ন অনেক উদ্যোক্তাকে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে। তবে এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। যেখানে প্রচলিত ব্যাংকঋণে সুদের হার দুই অঙ্কের কাছাকাছি, সেখানে স্বল্প সুদের অর্থায়ন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে মৌলিক পার্থক্য তৈরি করে। তাই সবুজ অর্থায়নের এই উদ্যোগ শুধু অব্যাহত রাখাই নয়, এর পরিধি বাড়ানো এবং আরো সহজলভ্য করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ কমানো প্রয়োজন।

আমরা হয়তো শিল্পের সব কারখানাকে একসঙ্গে সবুজ মানদণ্ডে আনতে পারব না। তবে সঠিক নীতির মাধ্যমে সবুজ রূপান্তরকে উদ্যোক্তাদের জন্য একমাত্র অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। স্বল্প সুদের অর্থায়ন, কর প্রণোদনা, সহজ কমপ্লায়েন্স এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই হতে পারে সেই নীতিগত জ্বালানি। তা না হলে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত গ্রিন ফ্যাক্টরি সাফল্য সস্তা ফ্যাশনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় একসময় শুধু একটি ব্যয়বহুল ফুটনোট হয়েই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

সব শেষে বলা যায়, টেকসই উৎপাদন ছাড়া বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায় না। কিন্তু টেকসই উৎপাদনকে যদি শুধু অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে এই রূপান্তর দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না। সরকার, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও উদ্যোক্তা—এই তিন পক্ষের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব।

পোশাক রপ্তানিতে অগ্রাধিকার আছে, ন্যায্যমূল্য নেই

আপডেট সময় : ০৩:১০:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
বিশ্ববাণিজ্যের বাস্তবতায় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এখন আর কোনো অতিরিক্ত সুবিধা বা ব্র্যান্ডিং কৌশল নয়; এটি একটি বাধ্যতামূলক শর্ত। জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে টেকসই উৎপাদন এখন ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—টেকসই উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য কি আমরা পাচ্ছি?

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিকসংখ্যক উচ্চমানের এলইইডি (লিড) সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার দেশ হিসেবে পরিচিত। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের শিল্পের সক্ষমতা, উদ্যোক্তাদের অঙ্গীকার এবং শ্রমিকবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণ।

তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, দেশের কয়েক হাজার পোশাক কারখানার তুলনায় সবুজ কারখানার সংখ্যা এখনো সীমিত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার দেওয়ার সময় সবুজ বা পরিবেশবান্ধব কারখানাকে অগ্রাধিকার দিলেও পণ্যের দামে সেই অগ্রাধিকারের প্রতিফলন প্রায় অনুপস্থিত।
সবুজ কারখানা গড়ে তোলা কোনো সহজ কাজ নয়। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, পানি পুনর্ব্যবহার ও শোধনাগার স্থাপন, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ—এসব নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের প্রচলিত কারখানার তুলনায় অনেক বেশি মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়।

এই বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ ও সমাজের জন্য উপকারী হলেও স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে এর আর্থিক চাপ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যখন পণ্যের দাম একই জায়গায় স্থির থাকে।ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বাজারগুলোতে পরিবেশগত স্বচ্ছতা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শর্ত এখন ক্রেতাদের কাছে কোনো প্রিমিয়াম সুবিধা নয়, বরং ন্যূনতম যোগ্যতা। অর্থাৎ শর্ত পূরণ না করলে অর্ডার পাওয়া যাবে না; কিন্তু শর্ত পূরণ করলে অতিরিক্ত মূল্য পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

ফলে টেকসই উৎপাদনের পুরো আর্থিক দায় কার্যত উৎপাদকদের কাঁধেই এসে পড়ছে।এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোর জন্য উদ্বেগজনক। বড় শিল্পগোষ্ঠী কোনোভাবে বাড়তি বিনিয়োগের চাপ সামাল দিতে পারলেও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সবুজ রূপান্তর ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এর ফলে শিল্পে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অনেক সম্ভাবনাময় কারখানা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

এই বাস্তবতায় টেকসই উৎপাদন উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কোনো বিকল্প নেই।

গ্রিন ফিন্যান্সিং, কনসেশনাল লোন এবং বিশেষ তহবিল গঠনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগঝুঁকি কমাতে হবে। একই সঙ্গে সরকারিভাবে কর প্রণোদনা, পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় এবং নীতিগত সহায়তা আরো জোরদার করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ ছাড়া শিল্পের বৃহৎ অংশকে টেকসই উৎপাদনের আওতায় আনা কঠিন হবে।তবে শুধু নীতিগত সহায়তা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে এখন ভলিউমনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ভ্যালুনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে এগোতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে কম দামে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানির যে মডেল, তা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। টেকসই উৎপাদনের সঙ্গে যদি উন্নত ডিজাইন, উচ্চমানের পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং দ্রুত উদ্ভাবন যুক্ত করা যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য আদায়ের সক্ষমতা বাড়বে।

তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। সাম্ক্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮৪ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যার মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই বাস্তবতা স্কষ্ট করে যে, পোশাকশিল্প শুধু একটি খাত নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

সবুজ বিনিয়োগে এখনো সরাসরি কর প্রণোদনা বা সমন্বিত জাতীয় নীতির অভাব স্কষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন টেকনোলজিক্যাল ফান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তুলনামূলক কম সুদে এই অর্থায়ন অনেক উদ্যোক্তাকে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে। তবে এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। যেখানে প্রচলিত ব্যাংকঋণে সুদের হার দুই অঙ্কের কাছাকাছি, সেখানে স্বল্প সুদের অর্থায়ন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে মৌলিক পার্থক্য তৈরি করে। তাই সবুজ অর্থায়নের এই উদ্যোগ শুধু অব্যাহত রাখাই নয়, এর পরিধি বাড়ানো এবং আরো সহজলভ্য করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ কমানো প্রয়োজন।

আমরা হয়তো শিল্পের সব কারখানাকে একসঙ্গে সবুজ মানদণ্ডে আনতে পারব না। তবে সঠিক নীতির মাধ্যমে সবুজ রূপান্তরকে উদ্যোক্তাদের জন্য একমাত্র অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। স্বল্প সুদের অর্থায়ন, কর প্রণোদনা, সহজ কমপ্লায়েন্স এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই হতে পারে সেই নীতিগত জ্বালানি। তা না হলে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত গ্রিন ফ্যাক্টরি সাফল্য সস্তা ফ্যাশনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় একসময় শুধু একটি ব্যয়বহুল ফুটনোট হয়েই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

সব শেষে বলা যায়, টেকসই উৎপাদন ছাড়া বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায় না। কিন্তু টেকসই উৎপাদনকে যদি শুধু অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে এই রূপান্তর দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না। সরকার, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও উদ্যোক্তা—এই তিন পক্ষের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব।