বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিকসংখ্যক উচ্চমানের এলইইডি (লিড) সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার দেশ হিসেবে পরিচিত। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের শিল্পের সক্ষমতা, উদ্যোক্তাদের অঙ্গীকার এবং শ্রমিকবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণ।
এই বাস্তবতায় টেকসই উৎপাদন উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কোনো বিকল্প নেই।
তৈরি পোশাক শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। সাম্ক্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮৪ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যার মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই বাস্তবতা স্কষ্ট করে যে, পোশাকশিল্প শুধু একটি খাত নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
সবুজ বিনিয়োগে এখনো সরাসরি কর প্রণোদনা বা সমন্বিত জাতীয় নীতির অভাব স্কষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন টেকনোলজিক্যাল ফান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তুলনামূলক কম সুদে এই অর্থায়ন অনেক উদ্যোক্তাকে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে। তবে এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। যেখানে প্রচলিত ব্যাংকঋণে সুদের হার দুই অঙ্কের কাছাকাছি, সেখানে স্বল্প সুদের অর্থায়ন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে মৌলিক পার্থক্য তৈরি করে। তাই সবুজ অর্থায়নের এই উদ্যোগ শুধু অব্যাহত রাখাই নয়, এর পরিধি বাড়ানো এবং আরো সহজলভ্য করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ কমানো প্রয়োজন।
আমরা হয়তো শিল্পের সব কারখানাকে একসঙ্গে সবুজ মানদণ্ডে আনতে পারব না। তবে সঠিক নীতির মাধ্যমে সবুজ রূপান্তরকে উদ্যোক্তাদের জন্য একমাত্র অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। স্বল্প সুদের অর্থায়ন, কর প্রণোদনা, সহজ কমপ্লায়েন্স এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই হতে পারে সেই নীতিগত জ্বালানি। তা না হলে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত গ্রিন ফ্যাক্টরি সাফল্য সস্তা ফ্যাশনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় একসময় শুধু একটি ব্যয়বহুল ফুটনোট হয়েই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
সব শেষে বলা যায়, টেকসই উৎপাদন ছাড়া বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায় না। কিন্তু টেকসই উৎপাদনকে যদি শুধু অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে এই রূপান্তর দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না। সরকার, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও উদ্যোক্তা—এই তিন পক্ষের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব।






















