স্মৃতি সব সময় ধূসর হয় না; কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন সেই স্মৃতি জড়িয়ে থাকে দেশের প্রধানতম কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে। ২০০৫ সালের আগস্ট মাস। আমি কারা অধিদপ্তরে ঢাকা বিভাগের ডিআইজি প্রিজনস হিসেবে যোগদান করি।
ডিআইজি প্রিজনস হিসেবে সেই বিশেষ কারাগারের দেখভাল এবং বন্দিদের সুবিধা-অসুবিধা তদারকি করা ছিল আমার নিয়মিত কাজের অংশ। সেই সুবাদেই কারান্তরালে বেগম খালেদা জিয়াকে খুব কাছ থেকে দেখার এবং তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতার সুযোগ ঘটেছিল। আজ যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন একজন রাজনৈতিক নেত্রীর চেয়েও একজন ধৈর্যশীল, মার্জিত এবং দেশপ্রেমিক মানুষের প্রতিকৃতিই আমার চোখের সামনে বেশি ভেসে ওঠে।
বেগম জিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় কিন্তু কারাগারের সেই চার দেয়ালে শুরু হয়নি। এর শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৮২ সালে আমি যখন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করি, তখন আমার প্রথম পোস্টিং হয় ‘এইট বেঙ্গল রেজিমেন্টে’। এই ব্যাটালিয়নটি ইতিহাসের সাক্ষী, কারণ এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। কুমিল্লায় অবস্থিত সেই ব্যাটালিয়নের সঙ্গে জিয়া পরিবারের এক আত্মিক সম্পর্ক ছিল।
১৯৮৩ সালের কথা। বেগম খালেদা জিয়া তখন সবেমাত্র রাজনীতিতে পা রেখেছেন। একদিন তিনি নোয়াখালীর পথে যাওয়ার সময় কুমিল্লায় আমাদের ব্যাটালিয়নে যাত্রাবিরতি করেন। সেই প্রথম আমি তাঁকে সরাসরি দেখি। ব্যাটালিয়নের ভেতর শহীদ জিয়ার ব্যবহৃত ক্যাপ, স্টিক এবং অন্য স্মৃতিচিহ্নগুলো তিনি গভীর মমতায় দেখেছিলেন। আমাদের মতো নবীন অফিসারদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার করেছিলেন। এরপর ১৯৯১ সালে তিনি যখন দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন আমি স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফের সদস্য হিসেবে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলাম। তবে এসএসএফের কঠোর প্রটোকলের কারণে তখন তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপের সুযোগ ছিল সীমিত। সেই সুযোগ আসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশে, কারাগারে।
সংসদ ভবন এলাকার সেই বিশেষ কারাগারে বেগম জিয়াকে যখন আনা হলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশ ছিল থমথমে। কিন্তু তাঁর মধ্যে আমি কোনো অস্থিরতা বা ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখিনি। তিনি ছিলেন অসম্ভব মিতভাষী এবং সংযমী। তিনি খুব অল্প আহার করতেন এবং কথা বলতেন অত্যন্ত মেপে। কোনো দিন কোনো কারারক্ষী বা কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি উচ্চবাচ্যে কথা বলেননি।
কারাগারে সাধারণত ভিআইপি বন্দিদের পক্ষ থেকে অনেক সময় অনেক ধরনের আবদার আসে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, বেগম জিয়ার কাছ থেকে আমরা কোনো দিন কোনো বাড়তি আবদার পাইনি। এমনকি তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও কোকো, যাঁদের পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল, তাঁরাও কারাবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতেন।
বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মাঝে মাঝে তাঁর পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে নানা পদের খাবার আসত। আমরা নিয়ম অনুযায়ী সেই খাবারগুলো পরীক্ষা করে তাঁর কাছে পৌঁছে দিতাম। কিন্তু তিনি খেতেন খুব সামান্যই। বেশির ভাগ সময়ই তিনি আমাদের উদ্দেশে বলতেন, ‘এগুলো নষ্ট করে লাভ নেই, আপনারা নিয়ে যান, আপনাদের পরিবারের জন্য নিয়ে যান।’ সেই খাবারগুলো পরে আমরা কারা কর্মকর্তা ও রক্ষীরা মিলে খেতাম। তাঁর এই উদারতা আমাদের মুগ্ধ করত।
তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর জন্য তাঁর উৎকণ্ঠা ছিল একজন সাধারণ মায়ের মতোই। সন্তানদের খোঁজখবর নিতেন প্রায় প্রতিদিন। এক দিনের কথা খুব মনে পড়ে। তিনি বড় ছেলে তারেক রহমানের কাছে একটি ছোট চিঠি লিখেছিলেন। তিন-চার লাইনের সেই চিঠির শুরুতে সম্বোধন ছিল ‘পিনু’। আমি তখনই প্রথম জানতে পারলাম যে আমাদের সবার পরিচিত তারেক রহমানের ডাকনাম ‘পিনু’।
চিঠির শেষে তিনি নিজের নাম লিখেছিলেন। আমি যখন চিঠিটি নিয়ে তাঁর ছেলের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলাম, তখন তাঁকে বিনীতভাবে বলেছিলাম, ‘ম্যাডাম, আপনি ছেলের কাছে চিঠি লিখেছেন, আমি অবশ্যই পৌঁছে দেব। তবে ভবিষ্যতে চিঠির নিচে নিজের নাম লিখবেন না। এতে আমাদের কোনো ক্ষতি হতে পারে।’ তিনি মুহূর্তেই আমার উদ্বেগ বুঝতে পারলেন এবং শান্ত স্বরে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনাদের বিপদ হতে পারে এমন কোনো কাজ আমি করব না।’ তাঁর এই সহযোগিতামূলক মনোভাব আমাদের দায়িত্ব পালনকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।
বেগম খালেদা জিয়ার মানবিকতার একটি বড় উদাহরণ ছিল অন্য বন্দিদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি। একই সময়ে বন্দি শেখ হাসিনার অসুস্থতার খোঁজখবর নিতেন। তিনি আমাকে বলতেন শেখ হাসিনার চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে এবং তাঁর প্রতি যত্নশীল হতে। রাজনীতির ময়দানে লড়াই থাকলেও ব্যক্তিগত ও মানবিক পর্যায়ে তিনি যে কতটা উঁচু স্তরের ছিলেন, তা এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়।
আরেকটি বড় ঘটনা ছিল খালেদা জিয়ার মায়ের মৃত্যু। সেই কঠিন সময়ে বেগম জিয়া, তারেক রহমান ও কোকোকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় শেষবিদায় জানানোর জন্য। প্যারোলের সময় শেষ হয়ে এলে আমি খালেদা জিয়াকে খবর পাঠাই। তিনি তখন খাবার খাচ্ছিলেন। অথচ আমাদের যাতে কোনো বিপদে পড়তে না হয় বা সময়ের হেরফের না হয়, সে জন্য তিনি অর্ধেক খাওয়া রেখেই দ্রুত উঠে প্রস্তুত হয়ে যান। পরে আমি যখন বিষয়টি জানতে পারি, তখন খুব কষ্ট পাই। তাঁর এই নিয়মানুবর্তিতা ও অন্যের প্রতি সম্মানবোধ ছিল অনন্য।
বেগম জিয়ার দূরদর্শিতা সম্পর্কে সম্প্রতি একটি নতুন তথ্য জানলাম। গত ২৩ নভেম্বর আমাদের এইট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক রি-ইউনিয়ন ছিল। সেখানে পুরনো অনেক অফিসার এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার মাহফুজ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেন। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চ মাসে, যখন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বাঙালিদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন এইট বেঙ্গলের বাঙালি সৈনিকদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই এইট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিও ছিলেন পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া ও টু-আইসি ছিলেন মেজর জিয়া (শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান)।
সেই সংকটময় মুহূর্তে ব্যাটালিয়নে কোনো জ্যেষ্ঠ বাঙালি অফিসার উপস্থিত ছিলেন না। কাজে তাঁরা বাইরে ছিলেন। সৈনিকরা দিশাহারা হয়ে তৎকালীন টু-আইসি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে যান। সাধারণ একজন গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেদিন অসামান্য সাহস ও দূরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘অফিসাররা না আসা পর্যন্ত অস্ত্র জমা দেবেন না।’ পরে সৈনিকরা অস্ত্র জমা দেননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তিনি শুধু সময়ের প্রয়োজনে নেত্রী হননি, নেতৃত্ব গুণ তাঁর রক্তে মিশে ছিল।
কারাগারে বেগম জিয়াকে আমি নিয়মিত ফজরের নামাজ পড়তে এবং কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখেছি। তাঁর প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল পেঁপে ও পেঁপের জুস। খুব ভোরে ঘুমানোর কারণে সকালে তাঁর উঠতে কিছুটা দেরি হতো, যা ছিল তাঁর কারাজীবনের দীর্ঘস্থায়ী রুটিন।
আজ এত বছর পর যখন আমি অবসরে, পেছনের দিকে তাকালে বেগম খালেদা জিয়াকে একজন সংগ্রামী নেত্রীর চেয়েও একজন মার্জিত, রুচিশীল এবং অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী হিসেবেই বেশি মনে পড়ে। ইতিহাসের কঠিন বাঁকে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে নিজের ধৈর্য বজায় রেখেছিলেন, তা সত্যিই বিরল। কারাগারের সেই অন্ধকার দিনগুলোতেও তাঁর চেহারায় যে আভিজাত্য এবং শান্ত ভাব আমি দেখেছি, তা আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর যে টান, তা তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজে ফুটে উঠত। এমন একজন নেত্রীকে কাছ থেকে দেখা আমার পেশাগত জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা।




















