ঢাকা ১২:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চার দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি মেট্রোরেলসহ চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত জাপানে অবস্থান করবেন। এ সময়ে তিনি দেশটির সরকারপ্রধানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি অবকাঠামো পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেবেন।

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি সোমবার (২৬ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে। সেখানে জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা তাঁকে স্বাগত জানাবেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অবস্থান করবেন।

প্রথম দিনের কর্মসূচি

সফরের প্রথম দিন সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের সভাপতি তারো আসোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ সময় লিগের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী তাতসুনোরি ইবায়াশি উপস্থিত থাকবেন বলে সফরসূচিতে উল্লেখ রয়েছে।

একই দিনে জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে সন্ধ্যায় নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি। এসব সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক

সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের আগে তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। পরে দুই দেশের সরকারপ্রধান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন।

শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েও মতবিনিময় হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশেষ গুরুত্ব পাবে বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় হ্রাস এবং জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়টি। এ ছাড়া অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার সম্ভাব্য উপায় নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

একই দিন প্রধানমন্ত্রী জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরা (জেইআরএ)-এর স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এরপর ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব ঘুরে দেখার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।

জ্বালানি অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরেজমিনে ধারণা নেওয়ার পাশাপাশি এসব খাতে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে এ সফরে।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্ব

সফরের তৃতীয় দিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়ার সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে জাপানের তৈরি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

একই দিনে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে বৈঠক এবং তাঁর আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার কর্মসূচি রয়েছে। জাপানের আরও ১৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুটি দলীয় বৈঠকেও অংশ নেবেন তিনি।

এসব আলোচনায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার সম্ভাবনা গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রেও এসব বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য

বুধবার বিকেলে টোকিওতে জেট্রোর কার্যালয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এ আয়োজনের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ফোরামে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিধি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

একই দিন সন্ধ্যায় টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকারীদের সঙ্গে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে হোটেল নিউ ওতানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে একটি কমিউনিটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এই আয়োজনের মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় এবং জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।

টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে সফর শেষ

সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেনে টোকিও থেকে নাগোয়া যাবেন। সেখানে তিনি টয়োটা মোটর করপোরেশনের মটোমাচি কারখানা পরিদর্শন করবেন।

পরিদর্শনকালে জাপানের আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা, শিল্পপ্রযুক্তি ও কারখানা পরিচালনার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকবে। পরে টয়োটা সুসো করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তোশিমিতসু ইমাইয়ের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

নাগোয়ায় অবস্থিত টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজিও পরিদর্শন করার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর। জাপানের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইতিহাস তুলে ধরা এ জাদুঘর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে সফরের শিল্প ও প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মসূচি শেষ হবে।

এরপর বুলেট ট্রেনে টোকিও ফিরে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরে রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং জাপানের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের শর্ত নিয়ে আলোচনা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প খাতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।

জনপ্রিয় সংবাদ

চার দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

চার দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আপডেট সময় : ১২:২০:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি মেট্রোরেলসহ চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত জাপানে অবস্থান করবেন। এ সময়ে তিনি দেশটির সরকারপ্রধানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি অবকাঠামো পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেবেন।

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি সোমবার (২৬ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে। সেখানে জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা তাঁকে স্বাগত জানাবেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অবস্থান করবেন।

প্রথম দিনের কর্মসূচি

সফরের প্রথম দিন সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের সভাপতি তারো আসোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ সময় লিগের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী তাতসুনোরি ইবায়াশি উপস্থিত থাকবেন বলে সফরসূচিতে উল্লেখ রয়েছে।

একই দিনে জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে সন্ধ্যায় নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি। এসব সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক

সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের আগে তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। পরে দুই দেশের সরকারপ্রধান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন।

শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েও মতবিনিময় হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশেষ গুরুত্ব পাবে বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় হ্রাস এবং জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়টি। এ ছাড়া অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার সম্ভাব্য উপায় নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

একই দিন প্রধানমন্ত্রী জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরা (জেইআরএ)-এর স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এরপর ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব ঘুরে দেখার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।

জ্বালানি অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরেজমিনে ধারণা নেওয়ার পাশাপাশি এসব খাতে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে এ সফরে।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্ব

সফরের তৃতীয় দিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়ার সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে জাপানের তৈরি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

একই দিনে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে বৈঠক এবং তাঁর আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার কর্মসূচি রয়েছে। জাপানের আরও ১৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুটি দলীয় বৈঠকেও অংশ নেবেন তিনি।

এসব আলোচনায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার সম্ভাবনা গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রেও এসব বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য

বুধবার বিকেলে টোকিওতে জেট্রোর কার্যালয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এ আয়োজনের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ফোরামে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিধি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

একই দিন সন্ধ্যায় টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকারীদের সঙ্গে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে হোটেল নিউ ওতানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে একটি কমিউনিটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এই আয়োজনের মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় এবং জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।

টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে সফর শেষ

সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেনে টোকিও থেকে নাগোয়া যাবেন। সেখানে তিনি টয়োটা মোটর করপোরেশনের মটোমাচি কারখানা পরিদর্শন করবেন।

পরিদর্শনকালে জাপানের আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা, শিল্পপ্রযুক্তি ও কারখানা পরিচালনার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকবে। পরে টয়োটা সুসো করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তোশিমিতসু ইমাইয়ের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

নাগোয়ায় অবস্থিত টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজিও পরিদর্শন করার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর। জাপানের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইতিহাস তুলে ধরা এ জাদুঘর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে সফরের শিল্প ও প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মসূচি শেষ হবে।

এরপর বুলেট ট্রেনে টোকিও ফিরে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরে রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং জাপানের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের শর্ত নিয়ে আলোচনা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প খাতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।