ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির অষ্টম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর ২০২৬) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৈঠকে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সংশোধন, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর নীতি অক্ষুণ্ন রাখা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার বিষয়গুলো আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং সাকিলা ফারজানা।
এ ছাড়া দেশের বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পাঠানো তালিকায় থাকা অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপকেরা বৈঠকে অংশ নেন। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ৪৪ জন উপস্থিত থেকে সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজেদের লিখিত ও মৌখিক মতামত এবং প্রস্তাব তুলে ধরেন।
বৈঠকে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলোর পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা, প্রস্তাবিত সংশোধনীর প্রভাব এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র অবস্থান এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর করার বিষয়েও মতামত উঠে আসে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন নিয়ে আলোচনা
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব। এ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ কতটা থাকবে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আলোচনায় প্রস্তাব উঠে আসে, আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা যেতে পারে।
এ ধরনের সংশোধন সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের পরিসর, সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা এবং দলীয় অবস্থানের সঙ্গে ব্যক্তিগত মতামতের ভারসাম্যের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বৈঠকের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে মতবিনিময়
বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোর দায়িত্ব ও ক্ষমতা আরও সুস্পষ্ট করার মাধ্যমে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় স্থান পায়।
এ ছাড়া বিচারক নিয়োগের জন্য আইন প্রণয়ন এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও কার্যক্রম পরিচালনায় স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও মতামত তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধি, দায়িত্ব ও স্বাধীনতা সুস্পষ্ট করার মাধ্যমে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি আরও কার্যকর করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও সংসদীয় কমিটি নিয়ে আলোচনা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় সংসদের উচ্চকক্ষের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও বৈঠকে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক কাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হতে পারে, তা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
পাশাপাশি সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের মনোনয়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং কমিটিগুলোর কার্যকারিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থার সম্ভাব্য গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা বিভিন্ন সাংবিধানিক বিষয়ে তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাব তুলে ধরেন। এসব মতামত সংবিধান সংশোধনের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির এ বৈঠকে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, সংসদীয় কার্যক্রম এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে একাধিক প্রস্তাব আলোচনায় আসে। এসব প্রস্তাবের চূড়ান্ত রূপ ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থেকে বিস্তারিত জানা যাবে।















