ভবিষ্যতে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ না পায়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্বের আলোচনার বিষয় ছিল ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকে কার্যকর ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী আইনি কাঠামো এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তাঁর মতে, এ ঘটনা দেশের সাংবিধানিক সংকট ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থানের পেছনে এ সিদ্ধান্তের ভূমিকা ছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামো সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা ও জাতীয় অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি বিচারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান বা অঙ্গের হাতেই যেন নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়, সে বিষয়ে সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকতে হবে।
এ সময় সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি চালু এবং গণভোটসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা করেন তিনি। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা বিভাজনের রাজনীতি চায় না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকে ধারণ করে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, ঐক্য ও সমঝোতা প্রয়োজন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান।
আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংবিধানিক পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।











