
বঞ্চনা অপমান আর নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। পাকিস্তান আমাদের কখনো সম্মান করেনি, আমাদের কথা শোনেনি, নাগরিক মর্যাদা দেয়নি। আমরা সেসব নীরবে মেনে নিইনি। তাই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা আমাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছি।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদাররা আমাদের ওপর কেমন অবর্ণনীয় নির্মম নির্যাতন করেছে আজ সেসব অনেকের কল্পনার অতীত। বর্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন আমরাও কল্পনা করতে পারিনি, রাস্তাঘাটে হাজারো নির্বিবাদী জনতার ওপর নির্বিচারে মেশিনগান চালাতে পারে, যেখানে সেখানে যার-তার বাড়িঘরে আগুন দেওয়া যায়, ঘরদোর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে কাউকে বেয়নেটে খুঁচিয়ে মারা যায়। এসব ছিল আমাদেরও কল্পনার অতীত। মিছিল করেছি, পুলিশ গুলি চালিয়েছে, আধাসামরিক বাহিনী গুলি করেছে। কোনো কোনো জায়গায় আন্দোলন বেশি বেগবান হলে মিলিটারি নামানো হয়েছে। কিন্তু হাজারো লাখো মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চলেনি। তা যদি হতো তাহলে ’৬৯-এ বায়তুল মোকাররমের বাইরে যেদিন হুজুর মওলানা ভাসানী বাধা পেয়ে রাস্তায় ‘আল্লাহ আকবর’ বলে আসরের নামাজে বসে পড়েছিলেন সেদিন গুলি চলত। প্রথমে দু-চারজন, তারপর দু-একশ, তারপর হাজারে হাজার। পাশেই মিলিটারি দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু গুলি করেনি। অশান্ত শহর, কোনোখানেই তাদের বেশি সময় অপেক্ষা করার উপায় ছিল না। হুজুরের নামাজ শেষ হচ্ছে না, তারা চলে গিয়েছিল। সেদিন কিন্তু পাকিস্তানি মিলিটারিরা নামাজের জামাতে নির্বিচারে গুলি চালায়নি। মিলিটারিরা চলে গেলে নামাজ থেকে উঠে হুজুর বিক্ষোভে ফেটে পড়েন, ‘মানি না মানি না, আগরতলা মামলা মানি না। আয়ুব খানের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে। ঘেরাও করো, ঘেরাও করো, গভর্নর হাউজ ঘেরাও করো।’ হাজার হাজার মানুষ যে যেদিকে পারছিল ছুটছিল, কেউ গভর্নর হাউসের দিকে, কেউ আবার আগরতলা মামলার বিচারকদের বাড়ির দিকে, কেউ ক্যান্টনমেন্টের দিকে। তারপর সেদিনও গুলি চলেছিল, মানুষ মরেছিল। কিন্তু সেটাকেও নির্বিচারে গুলি বলা চলে না।
এরপর বেশি দিনের কথা নয়, মাত্র কয়েক দিন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে আয়ুব খান মুক্তি দিতে বাধ্য হন। পরদিন তিনি হন বঙ্গবন্ধু। গণআন্দোলনের মহানায়ক ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ জাতির পক্ষ থেকে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করেন। যদি কেউ ভাবেন ব্যাপারগুলো কালি-কলমে লেখার মতো মসৃণ ছিল তাহলে ভুল করা হবে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য সব নেতা উদগ্রীব ছিলেন না, বরং অনেকেই তার মুক্তির বিরোধী ছিলেন। ’৬৮ সালে সালাম খান, আতোয়ার রহমান, শাহ আজিজ এদের থেকে বঙ্গবন্ধু খুব একটা বড় নেতা ছিলেন না। তখনো তারা তাকে মেনে নিতে চাননি। ইসলামপন্থী বা মুসলিম লীগঘরানার যেসব নেতা ছিলেন তারা তো নয়ই, খাজা সাহেবদের ঘরানারও তিনি ছিলেন চক্ষুঃশূল। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা যেমন আজও অনেকের চক্ষুঃশূল, ঠিক তেমনি। ’৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হলে আমরা যখন সেøাগান দিতাম, ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’ অন্য দলের নেতারা তো বটেই, আওয়ামী লীগেরও অনেক প্রবীণ নেতা বিরোধিতা করতেন, আমাদের গলা টিপে ধরার চেষ্টা করতেন। অনেক প্রবীণ নেতা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা সমর্থন করেননি, অনেকে তাকে জাতীয় নেতা হিসেবে স্বীকার করেননি।
৬ দফা, ১১ দফা মোট ১৭ দফা এটা যেমন সহজ শোনা যায়, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবিনামা তৈরি করা তেমন সহজ ছিল না। স্বাধীনতার পর অনেককে শত্রু মনে করলেও আওয়ামীঘরানার ছাত্রনেতারা সেদিন জান-প্রাণপণ করে ছাত্রসমাজের কাছে ১১ দফা দাবি তুলে ধরেছিলেন। আজ মতিয়া চৌধুরীর ভেংচি যতই মিষ্টি লাগুক, রাশেদ খান মেনন যতই নেত্রীর ভক্ত অনুরক্ত হন, সেদিন বঙ্গবন্ধু বা শেখ মুজিবের মুক্তির প্রশ্নে তারা কোনো ভূমিকা রাখেননি। বরং তারা তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বিরোধিতা করেছেন। সেই সময় সর্বজনাব শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শেখ ফজলুল হক মনি, কেএম ওবায়দুর রহমান, মাজহারুল হক বাকী, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আব্দুল কদ্দুস মাখন, লতিফ সিদ্দিকী এদের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। ছাত্র ইউনিয়নের লেখাপড়া জানা নেতাকর্মীদের সঙ্গে তখন পেরে ওঠা সহজ ছিল না। ’৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করলে তখনো অনেকে মেনে নেয়নি। আমি নিজে সাক্ষী, পল্টন ময়দানে জনাব লেনিন কীভাবে বঙ্গবন্ধুর নামের ইশতেহার ছিঁড়েছিলেন, মাইকে তার কর্কশ কণ্ঠ এখনো আমার কানে বাঁজে, ‘এই যে তোফায়েল, আমি তোদের বঙ্গবন্ধু চঙ্গবন্ধুকে টুকরো টুকরো করলাম।’ সেই লেনিনও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ছিলেন। তাই যে যাই ভাবুক, আগরতলা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু খুব সহজে মুক্তি পাননি। ’৭০-এর নির্বাচন এবং সেই নির্বাচনে বিজয় খুব সোজা ছিল না।
বলতে চাচ্ছিলাম, পাকিস্তানের জল্লাদ বাহিনী ২৫ মার্চ গভীর রাতে যেভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল, তা আমাদের কারো ধারণা ছিল না। শুধু ’৬৯-এর গণআন্দোলন কেন, ১ মার্চ ’৭১ ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত করলে যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়, সে সময় দেশের নানা স্থানে প্রতিরোধ সংগ্রামীদের ওপর গুলি চলে; তাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। কিন্তু ২৫ মার্চের মতো নয়। মার্চের শুরুতেই বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু কিছু সৈন্য দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে দিয়েছিল। উদ্দেশ্য, তারা যদি বিদ্রোহও করে তা যেন তেমন কার্যকর না হয়। কত আর হবে, সব মিলিয়ে দেড়-দুই হাজার। কারণ তখন বাঙালি মিলিটারি সর্বমোট পাঁচ-ছয় হাজারের বেশি ছিল না। তখন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাতটি পূর্ণ ব্যাটালিয়ন আর ৮ নম্বর তৈরি হচ্ছিল। সাড়ে সাতশ সৈন্য নিয়ে এক ব্যাটালিয়ন। সেদিক থেকে হিসাব করলে ৭ ঢ ৭ = ৪৯ আর ৭ ঢ ৫০ = ৩৫০ মোট ৫২৫০।
আর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত অষ্টম বেঙ্গলের সাড়ে চার-পাঁচশ এই ছিল বাঙালি পদাতিক সৈন্য। তার দুই বা তিন ব্যাটালিয়ন পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল। যারা পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ছিল তার অর্ধেকের বেশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি বা নিতে পারেনি। তারা পাকিস্তানিদের হয়ে হানাদারি করেছে। শুধু রাজাকারই পাকিস্তানের পক্ষে ছিল না। বাঙালি মিলিটারি, পুলিশরাও অনেকে পাকিস্তান হানাদারদের সঙ্গে ছিল। ১৯ মার্চ গাজীপুরের ঘটনা। ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব আরবার জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে গেলে হাজার হাজার লাখো সংগ্রামী জনতা তার পথ অবরোধ করে। সে সময় পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ারকে উদ্ধার করে ঢাকা পাঠাতে দায়িত্ব দেওয়া হয় দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর শফিউল্যাহকে। তিনি সে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত গুলিও চালিয়েছিলেন। তবে সেখানেও নির্বিচারে গুলি চলেনি। যতটা চালালে প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া যায়, লোকজন সরে যায় ততটাই চলেছে। মানুষজনও মারা গিয়েছিল। তবে শত শত, হাজারে হাজারে নয়। তাই অনেকের ধারণা ছিল না, ২৫ মার্চ নিজের দেশের মানুষের ওপর হানাদাররা ওইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। কারণ প্রথম অবস্থায় সত্যিই আমরা দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। এখন রাতদিন বসে বসে যারা মোবাইল টেপে, তারা সেই ভয়াবহ অবস্থা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না। এখানেই এখন আর তখনের পার্থক্য। আমরা পাকিস্তানিদের কাছে নতজানু হলে অত প্রাণ হারাতে হত না। তবে সারা জীবন তাদের দয়ার পাত্র হয়ে গুঁতা-নাতা খেয়ে থাকতে হতো। সব সময় তারা আমাদের বাপ-দাদার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করত, আমাদের রক্ত অপরিষ্কার, হিন্দুর রক্তের মিশ্রণ আছে এসব গালাগাল করত। কিন্তু আমরা আমাদের নির্ভেজাল রক্তের প্রমাণ দিতেই মূলত মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলামÑ মন্ত্রী-মহামন্ত্রী হতে নয়।
এখন যারা ধরাকে সরাজ্ঞান করে মানুষের বুকের ওপর হাঁটে তারা কি একবারও ভেবে দেখে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে যদি বের করে এনে বঙ্গবন্ধু বানাতে না পারতাম? যাদের অবদানে ’৭০-এর নির্বাচনে অমন সফলতা এসেছিল, মুক্তিযুদ্ধ করে যারা একটি দেশকে জন্ম দিয়েছি তাদের বাদ দিয়ে যারা এখন অত ক্ষমতার দম্ভ দেখান, বঙ্গবন্ধু মুক্তি না পেলে, ’৭০-এর নির্বাচন না হলে, বাংলাদেশ না হলে এই দম্ভ কোথায় থাকত?
কত বছর আওয়ামী লীগ করি না, তাও আওয়ামী লীগের দুরাচারের অভিযোগ থেকে বাঁচতে পারি না। প্রতিদিন রাস্তাঘাটে শত শত মানুষের দাবি, ‘একটা কিছু করুন, নেত্রীকে কিছু বলুন।’ কী বলব নেত্রীকে? নেত্রী কারো কথা শোনেন? যাদের কথা শোনেন তারা মানুষের মাথার ওপর পা দিয়ে হাঁটে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে যখন সীমান্তে দুর্গ গড়ে তুলেছিলাম, গৌরীপুর কলেজের দুই অধ্যাপক সুজিৎ চক্রবর্তী ও দীলিপ ধর যোগ দিয়েছিল। দীলিপ ধর ছিল সাদামাটা, কিন্তু সুজিৎ চক্রবর্তী খুবই মুখারো। ৭০ হাত মাটির নিচে রাখলেও সে মুখ বুঁজে থাকত না। শুধু যে খারাপ দিক ছিল তা নয়, ভালো দিকও ছিল। মস্কোপন্থী মানুষ, রাশিয়া বোমা ফেললেও তার মধ্যে শুভ কিছু খুঁজত। আমেরিকার খাদ্য ফেলাকেও বোমার চাইতে খারাপ মনে করত। আর কিছু না হলেও আমেরিকার খাদ্যে বিষ মেশানো কিংবা সেøা-পয়জনের সন্ধান করত। আমাদের কোনো সভা-সমিতি, ছোটখাটো বৈঠক হলে ক্ষমতাধরদের উদ্দেশে বলত, ‘দুন্ন্যাডারে মারবল ভেবো না, মানুষের মাথার উপর পা দিয়ে চলার চেষ্টা করো না, নির্যাতিত সংগ্রামী মানুষ একদিন তোমাদের পা গুঁড়িয়ে দেবে।’ আজ যখন দেখি, চাঁদপুর হাইমচরের নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কমলমতি শিশুদের মাথার ওপর দিয়ে হাইমচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর হোসেন পাটোয়ারী হাঁটেÑ দুঃখে-বেদনায় অন্তর ফেটে যায়। সাধারণত মাঝেসাজে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন করে। কিন্তু জামালপুর মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের জমিদাতা প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা দিলদার হোসেন প্রিন্স কমলমতি শিশুদের বুকের ওপর পা দিয়ে হেঁটে যখন মানবতার সভ্যতার কবর রচনা করে তখন সহ্য করা যায় না। এসব তস্করের সবাই সরকারি দলের।
তারা কী যে ক্ষমতা পেয়েছে, মাটিতে পা ফেলতে তাদের ভালো লাগে না। মানুষের বুকের ওপর দিয়ে হাঁটতে পা নিশপিশ করে। বিশ্বদরবারে সভ্য জাতি হিসেবে আমরা কীভাবে মুখ দেখাই। জাতীয় কৃষ্টি-সভ্যতা-মানবতা ও মনুষ্যত্বের কবর আদিম জামানায়ও কখনো এভাবে রচিত হয়নি, যা আজ অনবরত অহরহ হচ্ছে। কয়েক বছর আগে আওয়ামী গু-ারা হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় এমনভাবে এক নারী আইনবিদকে নির্যাতন করেছিল, যা মনে করতেও ঘৃণা হয়। কিন্তু এসবের প্রতিকার নেই। একটা দেশের মানুষ যখন নির্বিকার হয়ে যায়, ভালো-মন্দ প্রকাশের সব রাস্তা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন এমন গুমোট হাওয়া বইতে থাকে; যা সিরাজগঞ্জের মেয়র হালিমুল হক মিরু পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে গুলি করে সাংবাদিক হত্যা করে প্রমাণ করেছে। সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি গুলি খেয়ে মরে তা হলে একে সভ্য সমাজ বলি কী করে? কোথায় সভ্যতা? এ তো আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগকেও পেছনে ফেলে দেওয়ার অবস্থা। মনুসংহিতায় পড়েছিলাম, রাজা যখন কঠোর হয়, অপরাধীকে মৃত্যুদ- দেয়, পারিষদ লাগামহীন বেপরোয়া হয় তখন সে বংশের পতনের দিন ঘনিয়ে আসে। কেন যেন সবাই সহিংস হয়ে উঠেছে। কোথাও কোনো পরমত সহিষ্ণুতা নেই। সবাই অন্যকে ছোট করতে মরিয়া। অন্যকে ছোট করে কখনো যে বড় হওয়া যায় না, শেষ পর্যন্ত নিজেকেও ছোট হতে হয়Ñ কেন যেন ক্ষমতাবানরা অনেকেই এই সাদা কথাটা ভুলে গেছেন।
মগধ রাজ্যের পরাক্রমশালী নন্দ বংশের শেষ রাজার দুর্বল শাসনের প্রসঙ্গটা এখানে মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না। রাজা প্রজাদের প্রতি বেখেয়ালি ছিলেন। তার অন্যায় শাসনে প্রজাদের কাছে তিনি ভীষণ অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এটা খ্রিস্টপূর্ব তিন-সাড়ে তিনশ বছর আগের কথা। প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দার্শনিক প-িত, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যার ছিল গভীর জ্ঞান। লোকে তাকে গুরু চানক্য বলে ডাকতেন। কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও তাকে ডাকা হতো। তবে শেষের দিকে তিনি কৌটিল্য নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। রাজার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের নির্বাসিত করা হয়। মগধের রাজা একসময় গুরু চানক্যকেও কী কারণে অপমান অপদস্ত করেন। চানক্য সেই অপমান সহ্য করেননি। বিন্ধ্যালে নির্বাসিত চন্দ্রগুপ্তকে তিনি তার সব জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে উপযুক্ত করে তোলেন এবং একসময় নন্দ বংশের সিংহাসন চন্দ্রগুপ্তের হাতে আসে। চন্দ্রগুপ্তের লক্ষ্যে পৌঁছার এবং মগধের সিংহাসনে আহরণ করে মৌর্জ বংশ প্রতিষ্ঠার প্রধান ভূমিকায় ছিলেন গুরু চানক্য। চন্দ্রগুপ্তের পুত্র বিন্দুসার এবং তার তৃতীয় প্রজন্ম সম্রাট অশোক। চানক্য এক জায়গায় বলেছেন, ‘যে রাজা শত্রু বা বিরোধীদের সঠিক গতিবিধি লক্ষ না করে শুধুমাত্র অনুমানের ওপর অন্যের প্রতি অভিযোগ বা দোষ চাপায় সে তার নিজের পিঠে নিজেই ছুরিকাঘাত করে। অমন রাজার সিংহাসনে থাকা উচিত নয়। হয় তার নিজের সরে যাওয়া উচিত, না হয় দেশবাসীর সরিয়ে দেওয়া উচিত।’
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, রাজনীতিক ও কলাম লেখক






















